মৃত্যুর পরও থেমে থাকেনি মানবতার হাত, ‘আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ১৬ হাজার ৭০০ টাকার সহায়তা

মৃত্যুর পরও থেমে থাকেনি মানবতার হাত, ‘আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ১৬ হাজার ৭০০ টাকার সহায়তা

উজিরপুর প্রতিনিধিঃ বাঁচানো গেল না ক্যান্সার আক্রান্ত আনোয়ারকে, তবু থেমে থাকেনি সহমর্মিতা ‘আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ১৬ হাজার ৭০০ টাকা হস্তান্তর

শেষ পর্যন্ত আনোয়ার হোসেনকে বাঁচানো গেল না। ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে গত ৮ মে শুক্রবার মাগরিবের ঠিক ১০ মিনিট আগে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। কিন্তু মৃত্যুর মধ্যেও নিভে যায়নি মানুষের ভালোবাসা। বরং অসংখ্য মানুষের সহমর্মিতা ও মানবিকতার স্পর্শে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে।

কয়েক দিন আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছিল একটাই আবেদন আনোয়ার ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন।’ ক্যান্সারে আক্রান্ত এই তরুণের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। অসহায় পরিবারের আর্তি শুনে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন এবং ফেসবুকের শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে আসেন। গত ৪ মে থেকে শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রম। উদ্দেশ্য ছিল একটাই মানুষের ছোট ছোট অবদান একত্র করে আনোয়ারের চিকিৎসায় সহায়তা করা।

মাত্র তিন দিনের মধ্যেই সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সাড়া দেন। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ প্রবাসী, কেউ দিনমজুর, কেউ ব্যবসায়ী। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ ১০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, কেউ আরও বেশি অর্থ পাঠান। সব মিলিয়ে জমা হয় ১৬ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিটি টাকার সঙ্গে ছিল এক একটি প্রার্থনা আনোয়ার যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

কিন্তু মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয় না। নিয়তির নির্মম পরিহাসে চিকিৎসা শুরুর আগেই নিভে যায় একটি জীবন। তারপরও থেমে থাকেনি উদ্যোগ। বরং সংগৃহীত অর্থ কীভাবে সবচেয়ে অর্থবহভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করে আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন সিদ্ধান্ত নেয় এই অর্থের পুরোটা আনোয়ারের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনেই ব্যয় করা হবে।

আনোয়ারের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরপরই ফাউন্ডেশনের সদস্যরা তাঁর বাড়িতে ছুটে যান। শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে দাফন-কাফন ও জরুরি খরচের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ২,০০০ টাকা প্রদান করা হয়। পরিবারটির জন্য সেই মুহূর্তে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।

পরবর্তীতে এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের জন্য আরও ২,০০০ টাকা সহযোগিতা করা হয়, যাতে স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা একত্র হয়ে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করতে পারেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, আসর নামাজের পর এক আবেগঘন পরিবেশে আনোয়ারের মা ও ভাইয়ের হাতে অবশিষ্ট ১২,৭০০ টাকা তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের চোখে ছিল শোক, কৃতজ্ঞতা এবং মানুষের প্রতি গভীর আস্থা।

মোট সংগ্রহ ও ব্যয়ের হিসাব নিম্নরূপ : দাফন-কাফনের জরুরি সহায়তা — ২,০০০ টাকা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল  ২,০০০ টাকা, পরিবারের হাতে নগদ প্রদান — ১২,৭০০ টাকা ,মোট অনুদান ও ব্যয় — ১৬,৭০০ টাকা।

আমরা তাঁকে বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি :
 অর্থ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ রোমান মাহমুদ, কোষাধ্যক্ষ মোঃ রাসেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আব্দুল মান্নান, সহ-সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুর আলম, সহ দপ্তর সম্পাদক মোঃ মারুফ মৃধা, ওটরা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মোঃ রাসেল মৃধা, সমাজসেবক শাহরিয়ারসহ এলাকার আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

সাধারণ সম্পাদক মোঃ রোমান মাহমুদ বলেন: আমরা আনোয়ার ভাইকে সুস্থ করে তুলতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালার সামনে মানুষের সব পরিকল্পনা থেমে যায়। তাঁকে বাঁচাতে না পারার কষ্ট আজও আমাদের তাড়া করে। তবে মানুষের ভালোবাসায় সংগৃহীত অর্থ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছি। এই সহযোগিতা প্রমাণ করে, মানবতা এখনো বেঁচে আছে।”

কোষাধ্যক্ষ মোঃ রাসেল বলেন : এই তহবিলের প্রতিটি টাকার পেছনে আছে মানুষের আন্তরিকতা। কেউ হয়তো খুব সামান্য অর্থ দিয়েছেন, কিন্তু সেই সামান্য সহযোগিতাই একটি শোকাহত পরিবারের জন্য অনেক বড় শক্তি। আমরা সকল দাতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। মহান আল্লাহ তাঁদের দান কবুল করুন এবং রিজিকে বরকত দান করুন।

সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন: আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না। কেউ অসুস্থ, কেউ অনাহারে দিন কাটান। আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন সবসময় তাদের পাশে থাকতে চায়। আমরা বিশ্বাস করি, সমাজের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে এলে কোনো অসহায় পরিবার একা থাকে না।

আনোয়ারের পরিবারের সদস্যরা বলেন, এই সহযোগিতা শুধু অর্থের সহায়তা নয় এটি তাদের জন্য মানসিক শক্তি ও সাহসের উৎস। কঠিন সময়ে মানুষ যে এতটা আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে, তা তাঁদের নতুন করে আশাবাদী করেছে।

আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসহায়, অসুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাঁদের লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; বরং সমাজে সহমর্মিতা, দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা।

সংগঠনের পক্ষ থেকে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয় নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কারণ, বিপদের সময় সামান্য সহায়তাও একটি পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।

আনোয়ার হোসেন আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাঁকে ঘিরে মানুষের যে ভালোবাসা, তা তাঁর পরিবারকে দিয়েছে সান্ত্বনা, সাহস এবং নতুন করে জীবনকে ধারণ করার শক্তি। আর সেই ভালোবাসাকে সংগঠিত শক্তিতে রূপ দিয়েছে ‘আলোকিত সমাজ ফাউন্ডেশন’ যা স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষ পাশে থাকলে দুঃখও কিছুটা হালকা হয়ে যায়।